৩৩ কোটি দেবতার সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা জানুন

সনাতন ধর্মে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হল “৩৩ কোটি দেবতা”। প্রশ্ন হলো—যদি ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় হন, তাহলে ৩৩ কোটি দেবতা কীভাবে হতে পারে? আসুন বিষয়টি গভীরভাবে দেখি।

এটি দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়—

১. কোটি শব্দের অর্থ
বাংলায় কোটি অর্থ আমরা সাধারণত Crore ধরি, কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় “কোটি” শব্দের অর্থ হলো “ধরন” বা “প্রকার”। অর্থাৎ এখানে সংখ্যার কথা নয়, প্রকারের।

২. দেবতা শব্দের অর্থ
বেদে ‘দেবতা’ শব্দটি আসলে নেই। মূল সংস্কৃত শব্দ হলো দেব্, যার অর্থ শক্তি। অর্থাৎ ঈশ্বরের ৩৩ ধরনের শক্তির কথা বলা হচ্ছে।

যজুর্বেদে এর উল্লেখ:

“ত্রয়স্ত্রিং শতাস্তুবত ভুতান্য শাম্যন্ প্রজাপতিঃ। পরমেষ্ঠ্যধিপতিরাসীত্‍।” (যজুর্বেদ ১৪.৩১)
অনুবাদ: যাঁহার প্রভাবে গতিশীল প্রকৃতি নিয়ন্ত্রিত হয়, প্রজাদের রক্ষক, সর্বব্যাপী, আকাশে বিরাজমান—তাঁহার মহাভূতের ৩৩ প্রকার গুণের স্তুতি কর।

৩৩ ধরনের শক্তি:

  • শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪.৫ অনুযায়ী যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি শাকল্যকে বলেছেন—ঈশ্বরের ৩৩ প্রকার শক্তি রয়েছে।
    • ৮ বসু
    • ১১ রুদ্র
    • ১২ আদিত্য
    • ১ ইন্দ্র
    • ১ প্রজাপতি
    • মোট = ৩৩ প্রকার শক্তি
  • মনুসংহিতা ও বৃহদারণ্যক উপনিষদেও বিস্তারিত উল্লেখ আছে (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৩.৯.২–১১)।

যাজ্ঞবল্ক্য ও শাকল্য সংলাপ:
শাকল্য জিজ্ঞেস করলেন, “হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেব(শক্তি) কতটি?”
যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দিলেন: ৩৩টি।
পরে আবার ধাপে ধাপে—৬, ৩, ২, দেড় এবং শেষমেষ ১টি শক্তি।

অর্থাৎ ৩৩ কোটি নয়—এটি ৩৩ ধরনের শক্তির প্রতীকী সংখ্যা, যা ঈশ্বরের মহিমা ও শক্তির বিভিন্ন প্রকাশ বোঝায়।

৮ বসুগণ :- অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরীক্ষ, আদিত্য, দ্যৌ, চন্দ্র, নক্ষত্র
১১ রুদ্র হল:- প্রান(নিশ্বাস), অপান(প্রশ্বাস), ব্যন, সমান, উদাম, নাগ, কুর্ম্ম, কৃকল, দেবদত্ত,
ধনঞ্জয় এবং জীবাত্মা।
১২ আদিত্য হল- ১২মাস, ইন্দ্র, প্রজাপতি অর্থাত্‍ মোট ৩৩টি। ইন্দ্র হল বিদ্যুত্‍ আর প্রজাপতি হল যজ্ঞ(যে কোনশুভ কর্ম)।

তখন শাকল্য আবার জিজ্ঞেস করলেন তাহলে ৬টা দেব কি কি? তখন তিনি উত্তর দেন – অগ্নি,পৃথিবী, বায়ু,অন্তরীক্ষ, আদিত্য,দ্যুঃ। তখন তিনি বললেন তাহলে ৩টি দেব কি? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন তিনলোক (ভ্যু,দ্যু,অন্তরীক্ষ)।

তারপর শাকল্য আবার বললেন সেই দুইটি দেব কি কি? খাদ্য এবং প্রান-উত্তর দিলেন যাজ্ঞবল্ক্য। তখন আবার শাকল্য জিজ্ঞেস করলেন সেই দেড়টি কি? তখন যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দিলেন যিনি প্রবাহিত হন। তখন শাকল্য বললেন সেই এক এবং অদ্বিতীয় যিনি প্রবাহিত হন তাঁকে আপনি কিভাবে দেড় বললেন? তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন যখন তা প্রবাহিত হয় তখন ই সবকিছু উত্‍পন্ন হতে শুরু করে। তাহলে কে সেই এক? প্রান!!! হ্যঁ প্রান (পরমাত্মা) সেই এক এবং অদ্বিতীয় দেব যাকে সবাই তত্‍বলে জানে”

অসাধারন এই শৈল্পিক ও গভীর দার্শনিক কথোপকথন ব্যখ্যা করছে সেই এক এবং অদ্বিতীয় পরব্রহ্ম থেকে সবকিছু উত্‍পন্ন হতে শুরু করে। একে একে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য, ভু, দ্যু এবং অন্তরীক্ষলোক, বিদ্যুত্‍শক্তি সবকিছুই তার থেকে তৈরী হয় যাদেরকে ৩৩টি ভাগে ভাগ করা হয় এবং এদেরকে বলা হয় দেব অর্থাত্‍ শক্তি।

আর দিনশেষে শক্তি একটাই যা থেকে সকল কিছু আপাতশক্তি প্রাপ্ত হয়। আর এই শক্তিই এক এবং অদ্বিতীয় পরমাত্মা। আশা করি এর মাধ্যমে দেবতা এবং ৩৩কোটি দেবতা সম্বন্ধে আপনাদের ভুল ধারনা দুর হবে।।। 

” ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি “